প্রতি বছর ২০ অক্টোবর বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় দিবস হিসেবে উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হয়। ১৮৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা ব্রাহ্ম স্কুল থেকে যাত্রা শুরু করে দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে জ্ঞানচর্চা, মুক্তবুদ্ধি আন্দোলন, বাঙালির অধিকার আদায়ের লড়াই এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখ সারিতে নেতৃত্ব দেওয়া এই প্রতিষ্ঠান ২০০৫ সালের ২০ অক্টোবর পূর্ণাঙ্গ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হয়।
১. ১৮৫৮ থেকে ১৯০৫: বাংলার নবজাগরণ ও জগন্নাথের গোড়াপত্তন
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের (Bengal Renaissance) সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৮৫৮ সালে ব্রাহ্ম সমাজের সমাজসংস্কারকদের উদ্যোগে আরমানিটোলায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ঢাকা ব্রাহ্ম স্কুল’। ১৮৭২ সালে মানিকগঞ্জের বালিয়াটির জমিদার কিশোরীলাল রায় চৌধুরী তাঁর পিতা জগন্নাথ রায় চৌধুরীর স্মৃতি রক্ষার্থে বিদ্যালয়টির আর্থিক দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘জগন্নাথ স্কুল’।
পরবর্তীতে ১৮৮৪ সালে এটি দ্বিতীয় শ্রেণির কলেজ এবং ১৯০৮ সালে প্রথম শ্রেণির পূর্ণাঙ্গ ডিগ্রি কলেজে উন্নীত হয়। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় জগন্নাথ কলেজের বহু কৃতী শিক্ষক ও সমৃদ্ধ লাইব্রেরির বইপত্র নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গঠনে অনন্য ভূমিকা রাখে।
২. অধিকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে রক্তঝরা ইতিহাস
জগন্নাথ কেবল শিক্ষার প্রতিষ্ঠান ছিল না, বাঙালির প্রতিটি জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের স্ফুলিঙ্গ তৈরি হয়েছিল এই ক্যাম্পাসে:
- ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন: বায়ান্নর ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গের মিছিলে জগন্নাথ কলেজের শিক্ষার্থীরা সর্বাগ্রে অবস্থান নিয়েছিলেন। পুলিশের গুলিতে শহীদ রফিকউদ্দিন আহমেদ ছিলেন জগন্নাথের প্রাক্তন শিক্ষার্থী।
- ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও ৬ দফা: ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলন ও ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে জগন্নাথের ছাত্রনেতারা রাজপথে অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেন।
- ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ: ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী জগন্নাথ কলেজে নির্মম গণহত্যা চালায়। এর শহীদ মিনার গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের হত্যা করে গণকবর দেওয়া হয়। পরবর্তীতে শত শত শিক্ষার্থী মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে মাতৃভূমি স্বাধীন করেন।
৩. ২০০৫ সালের বিশ্ববিদ্যালয় রূপান্তর ও বর্ণিল আনন্দশোভাযাত্রা
স্বাধীনতার পর দীর্ঘ ছাত্র-শিক্ষক আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ২০০৫ সালের ২০ অক্টোবর বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০০৫’ (২০০৫ সনের ২৮ নং আইন) পাস হওয়ার মাধ্যমে কলেজটি পূর্ণাঙ্গ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়।
প্রতি বছর ২০ অক্টোবর প্রত্যুষে জাতীয় পতাকা ও বিশ্ববিদ্যালয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে দিবসের সূচনা হয়। এরপর ব্যান্ডপার্টি, ঢাকঢোল, বিশালাকার লোকজ পুতুল ও ঐতিহ্যবাহী ফেস্টুন সহযোগে বের হয় বর্ণাঢ্য আনন্দশোভাযাত্রা, যা পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে। দিনব্যাপী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নাট্যোৎসব, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও কনসার্টের মাধ্যমে মুখরিত থাকে ঐতিহাসিক ক্যাম্পাস।
Explore Related Resources on WishesIdeas
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের সম্পূর্ণ ডিরেক্টরি প্রোফাইল ও শুভেচ্ছা বার্তা কালেকশন এক্সপ্লোর করুন।